হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় যাত্রীসেবা বিঘ্নিত করা, ট্রলির অপব্যবহার, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও নির্ধারিত মূল্যের অতিরিক্ত দাম রাখার অভিযোগে একাধিক প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে। বুধবার (৭ অক্টোবর) অভিযানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সর্বমোট ১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। আদায়কৃত অর্থ নির্ধারিত সরকারি কোডে জমা করা হয়েছে।
এদিন রাত ১০টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইলে এ তথ্য জানান নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নওশাদ খান।
মূলত যাত্রী হয়রানি, লাগেজ চুরি কিংবা বিমানবন্দরের বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থান দ্রুতই নওশাদ খানকে পরিচিত করে তোলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসার পাশাপাশি যাত্রীদের কাছ থেকে তিনি পান ‘ফাটাকেষ্ট’ নাম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি ‘ম্যাজিস্ট্রেট নওশাদ’ হিসেবে পরিচিত থাকলেও বর্তমানে তার পদবি সিনিয়র সহকারী সচিব।
বুধবার রাতে দেওয়া পোস্টে তিনি জানান, বিমানবন্দর এলাকার বিভিন্ন স্থানে পরিচালিত এসব অভিযানে আগে গোপনে লোক পাঠিয়ে যাত্রীদের সহযোগিতায় অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হয়। অভিযোগের সত্যতা হাতেনাতে প্রমাণিত হওয়ার পর উপস্থিত সাক্ষী ও সংশ্লিষ্টদের দোষ স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অর্থদণ্ড করা হয়।
যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে বিমানবন্দরে চারজন এয়ারপোর্ট এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট প্রতিদিন দায়িত্ব পালন করছেন। বিশেষ করে যাত্রীদের ট্রলি ও লাগেজ ব্যবস্থাপনা সুশৃঙ্খল করতে ‘টিম এয়ারপোর্ট’-এর সহযোগিতায় বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যাত্রীদের ট্রলি সংকট কমাতে বিভিন্ন বিমানবন্দর থেকে ট্রলি এনে মেরামত করে প্রায় ৫০০টি ট্রলি নতুন করে যুক্ত করা হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে আরও ১ হাজার ট্রলি সরবরাহের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিশেষভাবে সুপারিশ করা হয়েছে।
ট্রলির যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে গঠন করা হয়েছে বিশেষ টিম। কোন পয়েন্টে কখন কতটি ট্রলি রয়েছে, তা সরাসরি যাচাই ও মনিটরিং করতে শিফটভিত্তিক বিশেষ হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপও চালু করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সম্প্রতি রানওয়ে মেরামতের কারণে রাতে কয়েক ঘণ্টা ফ্লাইট ওঠানামা বন্ধ থাকার পর পিক আওয়ারে একসঙ্গে বেশি ফ্লাইট অবতরণ করছে। এতে কোনো কোনো সময়ে বিমানবন্দরে থাকা মোট ট্রলির তুলনায় যাত্রীর সংখ্যা বেশি হয়ে যাচ্ছে। ফলে ট্রলি সংগ্রহের জন্য যাত্রীদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। এ ভোগান্তি কমাতে দ্রুত প্রয়োজনীয় সংখ্যক ট্রলি সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বছরে ৮০ লাখ যাত্রীকে সেবা দেওয়ার সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে বিমানবন্দরটি ব্যবহার করছেন প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ যাত্রী। তাদের সঙ্গে আসা-যাওয়া করেন আরও প্রায় ২ কোটি মানুষ। বিপুল মানুষের উপস্থিতির কারণে বিমানবন্দরে বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এসব অপরাধ প্রতিরোধ এবং যাত্রীদের অধিকার সুরক্ষায় নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি চালানো হচ্ছে।
এদিকে লাগেজ নিয়ে হয়রানি ও চুরির অভিযোগের বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দরে শেষ মুহূর্তে কোনো যাত্রী উপস্থিত না থাকলে নিরাপত্তার স্বার্থে লাগেজ পরীক্ষা করা হয়। এ সময় টিপ তালা বা মাস্টার কি দিয়ে খোলা সম্ভব নয়- এমন তালা খুলে নিষিদ্ধ বা নিরাপত্তাসংক্রান্ত সামগ্রী জব্দ করার ঘটনাও ঘটে। তবে এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিমানবন্দর থেকে যাত্রীকে নোটিশ না দেওয়ায় অনেক সময় বিভ্রান্তি তৈরি হয়। বিষয়টি প্রতিরোধে সিভিল এভিয়েশন অথরিটির মাধ্যমে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
যাত্রীর লাগেজ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করে অভিযোগ জানানোর সুযোগ রয়েছে। এছাড়া লাগেজ থেকে চুরি হয়েছে বলে সন্দেহ হলে কিংবা কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হলে বিমানবন্দরের দ্বিতীয় তলায় ১ নম্বর টার্মিনালের ১ নম্বর গেট সংলগ্ন এয়ারপোর্ট এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগ করা যাবে।
সপ্তাহের সাত দিন ২৪ ঘণ্টা পালাক্রমে একজন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট যাত্রীদের অভিযোগ গ্রহণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দায়িত্বে থাকেন। প্রতিটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বডি-ওর্ন ক্যামেরা ও সিসি ক্যামেরার ফুটেজ যাচাই করে লাগেজ চুরির সঙ্গে কারও সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরই মধ্যে এ ধরনের অপরাধে একাধিক ব্যক্তিকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
গত এক বছরে চার এয়ারপোর্ট এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট বিভিন্ন অপরাধে ১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং ৫২৪ জনকে কারাদণ্ড দিয়েছেন। নিয়মিত অভিযান ও তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা বিমানবন্দরে অপরাধ প্রতিরোধ এবং যাত্রীদের অধিকার সুরক্ষায় ভূমিকা রাখছে।
মন্তব্য করুন